হাওর পাড়ের সেই ছেলেটির বিসিএস ক্যাডার হয়ে ওঠার গল্প

মোহাম্মদ লালন মিয়া : গ্রামের ৮/১০ জন বালকের মতোই আমার শৈশব কেটেছে হাওর-বাওর বেষ্টিত খালিয়াজুরির মেন্দিপুর গ্রামের নদী, নালা আর গাছে চড়ে। তখন বিসিএস মানে বুঝতাম না। সারাদিন বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম বাড়ি আনাচে কানাচে, আম গাছে, জাম গাছে। বাড়ির পিছনের নদীতে সাঁতার কাটতাম বন্ধুবান্ধব মিলে। আমার এখনও মনে পড়ে গ্রামের সেই বন্ধুদের কথা, যাদের মধ্যে সোহেল, মাসুদ, ফরিদ, পরশ, জহিরুল অন্যতম। যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম খুব দুষ্টু প্রকৃতির হওয়ায় বছরের অধিকাংশ সময় থাকতাম মামা বাড়ি মদন থানার ধুবাওয়ালা গ্রামে।

কোন সময়ই ক্লাসে ভাল ছাত্র ছিলাম না, ভাল রেজাল্টও দেখাতে পারিনি। বন্ধুসুলভ হওয়ায় আমি যেখানেই যেতাম বন্ধু, আড্ডা লেগেই থাকত।

প্রাইমারি বৃত্তি পরীক্ষা নিয়ে পড়ে গেলাম বিপদে। বাবা দেওয়াতে চান না। কারণ বৃত্তি পাব না তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। আমারও কিছু বলার নেই। পরীক্ষা না দিলে আমার জন্য আরও ভাল, পড়াশোনা করা লাগবে না। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি করলেন মা। তিনি নাছোড়বান্দা পরীক্ষা দিতেই হবে। অবশেষে পরীক্ষা দিয়ে আসলাম। যেদিন ফল দিল পাশের বাড়ির মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আমাদের ঘুম থেকে তুলে সুসংবাদটা দিলেন, আমি মেন্দিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০১ সালে প্রাথমিক বৃত্তি লাভ করেছি।

বাবা চাচ্ছিলেন উচ্চ মাধ্যমিক ভাল একটা স্কুলে পড়ানোর জন্য। ভর্তি পরীক্ষা দিতে গেলাম মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরীক্ষা ঠিকই দিলাম কিন্তু ফলাফল খারাপ। মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভাবলাম পড়াশোনা বুঝি আর হবে না। পরে অনেক কষ্ট করে এবং ওই স্কুলের শিক্ষক আব্দুল ওয়াদুদ স্যারের সহায়তা ৭৬ রোল নিয়ে ভর্তি হলাম স্বপ্নের বিদ্যাপীঠ মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারী উচ্চবিদ্যালয়ে।

যদিও প্রথমে একটু একটু খারাপ লাগত বন্ধু শুণ্যতায়। আস্তে আস্তে বন্ধু বান্ধব বাড়ল, চেনা পরিচিত হল। আবার যেন সেই পুরাতন দিনগুলি ফিরে ফেলাম। পড়াশোনা বাদ দিয়ে সারাদিন খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকি। প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় খুব খারাপ অবস্থা। মোট ১০০০ নাম্বারের মধ্যে গণিতে ফেল সহ পেলাম ৪৭৬ নাম্বার।

এরপর আসলো মাধ্যমিক বৃত্তি পরীক্ষা-২০০৪। পড়াশোনার অবস্থা খুবই নাজেহাল। গণিত ভাল পারি না। কোনমতে দিয়ে শেষ করলাম মাধ্যমিক বৃত্তি পরীক্ষা। যেদিন বৃত্তির ফল দিল আমি বাসায় ছিলাম। জানতাম ফল দিবে তারপরও ফল জানতে স্কুলে যাইনি। আমি জানি পাব না। বিকালবেলা আমার গ্রামের সহপাঠী বন্ধু মুহসিন আমাদের বাসায় এসে বলল তুইতো বৃত্তি পেয়েছিস।

২০০৭ সালে মানবিক বিভাগ থেকে মোটামুটি মানের একটা রেজাল্ট নিয়ে ভর্তি হলাম ঢাকার নটরডেম কলেজে। আমার জীবনের মোড় ঠিক করে দিয়েছে মূলত এই কলেজ। এখানে এসে আমি বিসিএস মানে কি তা বুঝতে পারলাম। দেখলাম মেসের অনেক বড় ভাইরা বিসিএসের জন্য পড়াশোনা করেন।

২০০৯ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েই চলে আসলাম ফার্মগেটে ভর্তি কোচিং করার জন্য। যে মেসে উঠলাম তাতে দেখি আমাদের চেনা নেত্রকোনার অনেক অচেনা মুখ। তাদের মধ্যে সাকলাইন, রঞ্জিত, সালমান, নকি, সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পড়ছে। কোচিং করার সময় আমাদের আর্থিক অবস্থাটা একটু খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আমাদের ২ ভাই এক সাথে ঢাকায় থেকে পড়াশোনা করায় বাবাকে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো।

ভর্তি কোচিং করার সময় খুব পরিশ্রম করতাম। প্রায় ১২/১৩ ঘন্টা করে পড়তাম। অনেকের কাছে কিছুই না কিন্তু আমি তো এত পড়াশোনা করে অভ্যস্ত নই। আমার কাছে প্রচন্ড চাপ মনে হতো। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে কোন চিন্তাই মাথায় আসত না। অবশেষে মহান আল্লাহ তায়ালা ঢাবিতেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির সুযোগ করে দিল।

২০১০ সালের জানুয়ারির ৩০ তারিখ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু হল সাথে সাথে আমার আড্ডাবাজিও শুরু। আমি বিসিএসের জন্য পড়া শুরু করেছি মূলত ৩য় বর্ষ থেকে। কিন্তু যদি আরো আগে থেকে পড়াশোনা করতাম হয়ত আরও ভাল করতে পারতাম। আসলে বিসিএস প্রস্তুতি কয়েকদিনের বিষয় নয়। এর জন্য দরকার দীর্ঘস্থায়ী সাধনা, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা।

যারা বিসিএস পরীক্ষা দিতে আগ্রহী তারা সরকারি, বেসরকারি, জাতীয় যেখানেই ভর্তি হও না কেন ১ম বর্ষ থেকেই মোটামুটি মানের পড়াশোনাটা চালিয়ে যাও। তাতে লাভটা হবে যে, শেষে তোমাকে এতো চাপ নিতে হবে না। আমরা শেষ বয়সে এসে খুবই পড়াশোনা করি। অথচ একই রেজাল্ট করব যদি আমরা আগে থেকেই একটু একটু করে পড়ে রাখতাম।

আমাদের অনেকেরেই ধারণা বিসিএস বোধহয় শুধু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই হয়। এই ধারনাটা ভুল। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক ক্যাডার বের হয়। তাই যারা বিসিএস দিতে চান তাদের প্রতি আমার শুভকামনা রইল।

মোহাম্মদ লালন মিয়া
৩৫ তম বিসিএস, শিক্ষা ক্যাডার
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *